হুমকির মুখে ভূগর্ভস্থ পানি: দায়ি কৃষক

Share This:

[মতামত]

মোহাম্মদ খায়রুল বাশার

আরবের তরল সোনাখ্যাত তেল আর আমাদের  তরল সোনা হতে পারে ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানি- যা সংরক্ষণে হতে পারে আগামীর সঞ্চয়। শত হতাশার মাঝে এক টুকরা আশার আলো। আজকের সঞ্চয় আগামী দিনের নিরাপত্তা।

লক্ষ লক্ষ বছর ধরে ভূগর্ভে জমা হয়েছে এই পানি।কিন্তু মাত্র ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে উদ্বেগজনিত ভাবে কমে আসছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। যেদিন থেকে মানুষ গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি উত্তলন করা শিখেছে,সেদিন থেকেই শুরু হয়েছে পানির স্তর নিচে নামা।

যে কারণে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তলন করি এবং পানির স্তর নিচে নামছে

১) পান করার জন্য।
২) গৃহস্থালি কাজ-কর্ম করার জন্য।
৩) কৃষি কাজ করার জন্য।
৪) কলকারখানায় ব্যবহারের জন্য।

ভূগর্ভস্থ পানি উত্তলনের ফলে যে সমস্যা হতে পারে বা যে ক্ষতি হবে:

১) নিরাপদ পানির সংকট দেখা দিবে
২) ভূমিধ্বস হবে। ভূগর্ভের পানি  উত্তলনের ফলে  কিছু দিনের মধ্যেই দেশে একটা বিপর্যয় দেখা দিবে তাহলো ভূমিধ্বস। হঠাৎ করে একদিন কোন এক অঞ্চল দেবে যাবে। কারণ বাংলাদেশের ভূমি দাড়িয়ে আছে ভূগর্ভস্থ পানির উপরে।

আমাদের দেশের সাধরণ মানুষ, কৃষক ও কলকারখানার মালিকেরা কোন প্রকার নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, যে যার মতো ভূগর্ভস্থ পানি নিজেদের খেয়াল-খুশী অনুযায়ী ব্যবহার করছে। এতে করে হুমকির মুখে ভূগর্ভস্থ পানির উৎস।

সাধারণ মানুষের নিরাপদ পানির অন্যতম উৎস হলো এই ভূগর্ভস্থ পানি। এই একটি মাত্র উৎস তাদের। তাদের কাছে বিকল্প কোন পথ নেই। তাই সাধারণ মানুষ এক প্রকার বাধ্য হয়ে এই পানি পান ও গৃহস্তালিত কাজে ব্যবহার করছে।

কৃষকদের কাছেও এই একটি পথ ছাড়া সুবিধা জনক আরেকটি বিকল্প পথ নেই । তবে কিছু কিছু অঞ্চল আছে যেখানে একের অধিক পথ আছে। যেসব অঞ্চলে একের অধিক সুযোগ আছে ঐ সব অঞ্চলের কৃষকরা ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করেনা। তারা সেই বিকল্প সুযোগটি ই কাজে লাগাচ্ছে।

এই কথাটি কলকারখানার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তাদের কাছে বিকল্প সুযোগ নেই। যদি থাকতো তাহলে হয়তো তারা ঐ সুযোগটি ব্যবহার করতো।তাদের কাছে যদি বিকল্প পথ থাকতো তাহলে হয়তো তারা সে পথটি ব্যবহার করতো।

এখন কথা হলো সরকার তাদেরকে একটা সুযোগ করে দিক। সরকার যদি সুবিধাজনক একটা পথ করে দিতে পারে, তাহলে তারা ঐ সুবিধা গ্রহণ করতে  অস্বীকৃতি জানাবেনা।

সরকার কেন করবে ?

যে কারণে করতে হবে তাহলো সরকার হলো এদেশের মানুষের অভিভাবক। প্রত্যকটি অভিভাবকের কাজ হলো নিজের সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা দেয়া বা করা।

সরকার যদি আজকে কোন বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ না করে তাহলে আগামীকাল দেখা দিবে চরম আকারের সুপেয় পানির অভাব এবং ভূমিধ্বস। তখন বাধ্য হয়ে সরকার বিকল্প কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। কিন্তু সরকার যদি আজকে বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করে তাহলে দেশ ও জাতি উভয়েই লাভবান হবে। বর্তমান সৌদি আরব নিজেদের পানির প্রয়োজন মেটাতে বিলিয়ন বিলিয়ন মার্কিন ডলার খরচ করছে শুধু সুপেয় পানির জন্য। যদি আজকে আমরা বিকল্প সুযোগ তৈরি না করি হয়তো আমাদের ও ঠিক সৌদির অবস্থা হতে পারে এবং তা বেশি দূরে নয়।

এখন প্রশ্ন হলো কী করবে কী ভাবে করবে?

১) পানি অবাধে  উত্তলন থেকে বিরত রাখতে হবে। পান করা ব্যতিত অন্য কোন কাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা যাবেনা।
২) সরকার পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহ করবে। সহজভাবে ভোক্তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ঠিক যেমন শহর আঞ্চলে দেয়া হয়।

এখন কথা হলো পানি কোথা থেকে পাবে?

বাংলাদেশ অবস্থানগত কারণে একটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। এদেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং আমাদের দেশ একটি নদী মাতৃক দেশ।সারা বছর নদীতে পানি থাকে।

কীভাবে পানি সংরক্ষণ করবে সেটা একটা বিষয়। তবে তা জটিল কোন বিষয় নয়।যেভাবে পানি সংরক্ষণ করা যেতে পারে।

১) নদী খনন করে গভীরতা বৃদ্ধি করে তার ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে বর্ষার পানি ধরে রেখে।
২) পুকুর খনন করার মাধ্যমে পানি ধরে রেখে।
৩) খাল খনন করে।

নদী হলো সবচেয়ে বড় আধার পানি ধরে রাখার জন্য। তারপর পুকুর এবং খাল। আমরা এসব উৎসের পানি ভোক্তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারলেই ভবিষ্যতের আসন্ন  বিপদ থেকে মুক্তি পেতে পারি।

কীভাবে নদীর পানি বা সংরক্ষিত পানি পৌঁছে দিতে পারি?

১) পাইপ লাইনের মাধ্যমে আমরা যে কোন স্থান থেকে পানি সরবরাহ করতে পারি।যেহেতু আমাদের দেশ নদী মাতৃক সেহেতু সহজেই পানি পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। বাংলাদেশের এমন কোন জেলা নেই যে জেলায় নদী নেই।

২) খাল খননের মাধ্যমে ভোক্তাদের কাছে পানি পৌঁছে দিতে পারি।যা সনাতন এবং বহুল জনপ্রিয় ও খরচ সীমিত।

৩) পুকুর খননের মাধ্যমে পানি ধরে রেখে এবং সেই পানি সরবরাহ করে। তবে সরকার প্রতি ১০০ পরিবারের জন্য একটি পুকুর বরাদ্দ রাখতে পারে।

সরকার নদী থেকে পানি পুকুরে জমা করবে। সেই পানি সকলে নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করবে।

এতে করে ভূগর্ভস্থ পানির যেই সংকট দেখছি তা আর থাকবেনা। যে পরিমাণ পানি আমরা পান করবো ঠিক সেই পরিমান পানি ভূগর্ভে আবার জমা হবে বর্ষা কালে।

আমাদের এ খনিজ সম্পদ হতে পারে আগামী দিনের সঞ্চয়। যা বিক্রি করে অর্জন করতে পারবো বৈদেশিক মুদ্রা। এখন তেল কে বলা হয় তরল সোণা, তাহলে কি আমরা বলতে পারিনা আগামীদিনের তরল সোনা হতে চলেছে আমাদের ভূগর্ভে জমা হওয়া বিশুদ্ধ পানি।

ইতিহাস বিজ্ঞানিরা ধারণা করছে ভবিষ্যতে যদি কোন যুদ্ধ হয় তবে সেটা হবে বিশুদ্ধ পানির জন্য। তাহলে কি আমরা তখন সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবো না?

আমি হলফ করে বলতে পারি এই খনিজ পানি হবে আমাদের অন্যতম সম্পদ ঠিক  গ্যাস ও  তরল সোনার ( তেল) মত।

আমাদের সরকারকে তরল সোনার ( ভূগর্ভস্থ পানি) দিকে নজর দিতে হবে।আজকের দিনের দরিদ্র জন গোষ্ঠীর আয়ের অন্যতম উৎস হবে এই খনিজ পানি।

আসন্ন অবশ্যম্ভাবি বিপদ থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষার জন্য এখনি পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। অন্যথায় দেশ ও জাতি অকল্পনীয় বিপদের সম্মুখীন হতে চলেছে। কারণ আমাদের দেশ ভেসে আছে ভূগর্ভস্থ জলের উপরে। তাই বলতে চাই সরকার যেন এদিকে বিশেষ ভাবে নজর দেয়। অন্যথায় আমাদের দেশ ও আমরা বিলীন হয়ে যাবো চিরতরে।

গবেষক
মোহাম্মদ খায়রুল বাশার

Loading...