সিলেট নগর ভবনে আতঙ্ক

ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে:

কয়েকদিন ধরে অসুস্থ বোধ করছিলেন সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। এই অসুস্থতাবোধের মধ্যেও তিনি ছিলেন সরব। এর মধ্যে দু’দিন আগে করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দিয়েছিলেন। নমুনা দিলেও তিনি আগের মতোই সরব ছিলেন কর্মকাণ্ডে। বৃহস্পতিবার রাতে তিনি নিজ কার্যালয়ে একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে বৈঠক শেষে  আপ্যায়ন করছিলেন। কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী সহ বৈঠকে অংশ নেয়া লোকজনও ছিলেন উপস্থিত। এমন সময় ল্যাব থেকে রিপোর্ট এলো মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী করোনা পজেটিভ। মুহূর্তে বদলে যায় পরিবেশ।

আতঙ্কও দেখা দেয়। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নিজেও সতর্ক হয়ে যান। দ্রুত আপ্যায়ন শেষ করে তিনি আইসোলেটেড হয়ে যান। ল্যাব রিপোর্টে আরো জানা গেল, সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমানের করোনা পজেটিভ। মেয়র আরিফ ও প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজ করোনা আক্রান্ত হওয়ায় সিলেট সিটি করপোরেশনে নতুন করে করোনা আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নগর ভবনের করোনা নিয়ে উদ্বিগ্নও। তারা জানিয়েছেন- করোনা কালে স্বাভাবিক রয়েছে নগর ভবনের সব কর্মকাণ্ড। কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা নিয়মিত ডিউটি করছেন। কিন্তু নগর ভবনে স্বাস্থ্যবিধির কোনো বালাই নেই। প্রতিদিন শত শত মানুষ নগর ভবনে বিভিন্ন কাজকর্মে আসেন। তারাও স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করেই ঢুকে পড়ছেন বিভিন্ন দপ্তরে। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর দপ্তরও ছিল সবার জন্য খোলা। চাইলে যে কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে পারতেন। ফলে স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণেই সিলেট নগর ভবনে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। আর শেষ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হলেন মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী নিজেই। মহামারি করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর থেকেই নগর ভবনে শনাক্ত হতে থাকে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। প্রথমেই আক্রান্ত হয়েছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের সিনিয়র কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আজাদুর রহমান আজাদ। এরপর প্যানেল মেয়র কাউন্সিলর এডভোকেট রোকশানা বেগম শাহনাজ ও সিনিয়র কাউন্সিলর শাহানারা বেগমও করোনায় আক্রান্ত হন। এর মধ্যে প্যানেল মেয়র রোকশানা বেগম শাহনাজ করোনার সঙ্গে লড়াই করে আইসিইউ থেকে ফিরে এসেছেন। কাউন্সিলররা যখন আক্রান্ত হতে শুরু করেন তখন একেক করে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা আক্রান্ত হতে থাকেন। প্রায় এক মাস আগে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন কর আদায়কারী সৈয়দ মিজান। তিনি অফিসে কাজ করতে গিয়েই করোনায় আক্রান্ত হন বলে তার সহকর্মীরা জানিয়েছেন। এরপর কয়েক দিন হাসপাতালে থাকার পর তিনি করোনার কাছে হেরে যান। এছাড়া- করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন সিলেট নগর ভবনের নির্বাহী প্রকৌশলী আলী আকবর, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম, একাউন্ট অফিসার আনম মনসুফ, মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী মুহিবুল ইসলাম ইমন। নগর ভবনের এক কর্মকর্তা গতকাল জানিয়েছেন- সিলেট সিটি করপোরেশনে প্রায় ৪০০ কর্মকর্তা ও কর্মচারী রয়েছেন। এর বাইরে রয়েছেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। কর্মচারীদের মধ্যে আরো প্রায় ২০ জনের মতো করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। তারা বিভিন্ন সময় চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়েছেন। কর্মকর্তা ছাড়া কর্মচারীদের করোনা আক্রান্তের বিষয়টি অনেকেই জানেননি। আবার অনেকেই করোনা উপসর্গ নিয়েও দায়িত্ব পালন করছেন। করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম। শুধু তিনিই নন তার পরিবারের সদস্যরাও আক্রান্ত হয়েছিলেন। তার পিতাও করোনা আক্রান্ত হন। এর আগে গত রমজানের পরপরই মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামা হক চৌধুরীও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। অবশ্য তিনি নিজ বাসাতে আইসোলেশনে থেকে সুস্থ হয়েছেন। একই সময় মেয়রের একান্ত সহকারীও করোনা আক্রান্ত হয়েছিলেন। নগর ভবনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জানিয়েছেন- একের পর এক কর্মকর্তা ও কর্মচারী করোনা আক্রান্ত হলেও নগর ভবনে স্বাস্থ্যবিধি পালনে কারো নজর ছিল না। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীও ছিলেন বেপরোয়া। তিনি নিজেও মাস্ক ব্যবহার না করে প্রতিদিনই একাধিক বৈঠক করেছেন নগর ভবনে। এছাড়া- নগরীর উন্নয়ন কাজ তদারকি ও পরিদর্শন, সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগদানে তিনি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থেকেছেন। করোনা শনাক্ত হওয়ার দিনও তিনি নগর ভবনে কয়েক দফা বৈঠক করেন। রাতে একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের সঙ্গে বৈঠকেও ছিলেন। সপ্তাহখানেক আগে  মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী কয়েকদিন আগে সিসিক’র পারিষদ নিয়ে চাঁদপুর সফর করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন, প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান, নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুল হক, হিসাব কর্মকর্তা আ ন ম মনছুফ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা হানিফুর রহমান। এছাড়া মেয়রের সহকারীরাও সঙ্গে ছিলেন। কাউন্সিলররা জানিয়েছেন- সিলেট সিটি করপোরেশনে প্রবেশের পথে স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো কার্যক্রম নেই। করোনার প্রথম দিকে সিটি করপোরেশনে আগতদের হ্যান্ডি থার্মোস্ক্যানার দিয়ে পরীক্ষা করা হতো। পরবর্তীতে সেটিও আর করা হয় না। প্রবেশ মুখে হাত ধোয়ার জন্য বেসিন রয়েছে। কিন্তু সেটি এখন আর কেউ ব্যবহার করেন না। এছাড়া একটি জীবাণুনাশক টানেল কেনা হলেও সেটি আর বসানো হয়নি। ফলে নগর ভবনে ঢোকার প্রবেশ পথে কোনো বাধা ছাড়াই প্রতিদিন শত শত সেবা প্রত্যাশী ব্যক্তি ঢুকেছেন। মেয়র আক্রান্ত হলেও এ ব্যাপারে এখনো করপোরেশনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর ঘনিষ্ঠজনেরা জানিয়েছেন- করোনা শনাক্ত হওয়ার পর থেকে আইসোলেটেড হয়ে গেছেন মেয়র নিজেই। বাসাতেই তিনি সুস্থ রয়েছেন। তার তেমন সমস্যা নেই। একই অবস্থা প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমানেরও।

সুত্র: দৈনিক মানবজমিন

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Share via
Copy link
Powered by Social Snap