ব্যাংকগুলো এখন লোন দিতে ভয় পায়: ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

তামান্না মোমিন খান:


অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথম শর্তই হচ্ছে দুর্নীতি রোধ করা। কিন্তু আমরা দেখছি দেশের সব সেক্টরে দুর্নীতি হচ্ছে। মানবজমিন-এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এ কথা বলেন। তার মতে, দুর্নীতি কমবে, যদি দ্রুত তদন্ত করে দুর্নীতিবাজদের দ্রুত শাস্তি দেয়া যায়। সালেহ্‌উদ্দিন আহমেদ বলেন, শাস্তি শুধু চাকরিচ্যুত করা তা না, ক্রিমিনাল আইনে যেন তাদের বিচার করা হয়। আমাদের  দেশের অর্থ-সম্পদ এমনিতেই সীমিত। আর এই অর্থের যদি সদ্ব্যবহার না হয় তা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা দেশের উন্নয়নের জন্য বাইরের দেশ থেকে ঋণ নিয়ে আসি।

সেই ঋণের আবার সুদ দিতে হয়। অথচ সেই ঋণের অর্থে যদি দুর্নীতি হয় এটা দেশের জন্য একটা বিরাট ক্ষতি। ঋণের যেটা বেনিফিট পেতাম সেটা উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কাজেই এই দুর্নীতি যদি আমরা বন্ধ না করি, বিশেষ করে প্রকল্পগুলোর দুর্নীতি। আবার প্রকল্পগুলো যদি সময় মতো শেষ না করা হয়। সেখানে ক্ষতি হচ্ছে। এই যে কয়েক বছর পরে আবার রিভাইজ করে প্রকল্পের খরচ দ্বিগুণ করা হয় এটাও অত্যন্ত দুঃখজনক। তিনি বলেন, প্রকল্পগুলো সময়মতো বাস্তবায়ন করতে হবে এবং তা অবশ্যই গুণগত মান বজায় রেখে। প্রকল্পেগুলোর দুর্নীতি, পরিচালকদের গাফিলতি, অদক্ষতা  এগুলো দূর করা খুব একটা কঠিন নয়। সবাই যদি সম্মলিতভাবে চেষ্টা করে এবং মনিটরিং করে তাহলেই সম্ভব হবে।
বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনীতি সম্পর্কে সালেহউদ্দিন বলেন, অর্থনীতি সচল রাখতে হলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পুনর্গঠন করতে হবে। এটা করতে না পারলে কিন্তু লোকজন স্বাভাবিক কাজ কর্মে ফিরে যেতে পারবে না। সেজন্য এক নম্বরে স্বাস্থ্যকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে- বেঁচে থাকার জন্য জীবিকার যেটা দরকার সেটার জন্য সরকার একটা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে । কিন্তু প্যাকেজের বাস্তবায়নে খুব ধীরগতি। আমরা যেটা ভেবেছিলাম সরকারের প্যাকেজ ঘোষণার ফলে অর্থনীতিতে  দ্রুত  করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারবো কিন্তু বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও বৃহৎ শিল্পে কিছুটা ঋণ যাচ্ছে ওরা মোটামুটি উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। রপ্তানিতে মোটামুটি ইতিবাচক সিগন্যাল পাওয়া গেছে। রেমিটেন্স বেড়েছে। তবে, যেভাবে বাহির থেকে শ্রমিকরা ফিরে আসছে সামনে হয়তো রেমিটেন্স কমে যাবে। এখন আমাদের যে কাজটা করতে হবে সেটা হলো প্যাকেজের বাইরেও রিট্রেনিং প্রযুক্তিগত বিষয়ে দিতে হবে যেন যে সমস্ত লোকজন দেশে ফেরত এসেছে তারা আবার বাইরে যেতে পারে। এবং দেশের মধ্যেও আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। করোনার ফলে দেশে অনেক বেকারত্ব বেড়েছে। এর সঙ্গে দেশের বাহির থেকে যারা আসছে তারাও যোগ হয়েছে। আমাদের যে কাজটা করেতে হবে সেটা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উপর জোর দিতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক হলো সরকার যে বিশ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করেছে তারমধ্যে মাত্র সাতশ’ থেকে একহাজার কোটি টাকা ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে দেয়া হয়েছে। এটা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। কৃষি খাতেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। কৃষি বলতে শুধু শস্য নয় মৎস্য প্রাণিসম্পদ সহ পুরো খাতটাতেই ভর্তুকি কম হয়েছে। আবার সমস্ত কৃষিখাতে ঋণ ছাড় ও খুব ধীরগতিতে হচ্ছে। এটা বাড়াতে হবে।  সেই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিকে উজ্জীবিত করতে হবে। পুঁজিবাজার প্রসঙ্গে সাবেক গভর্নর বলেন, আমি মনে করি ভালো ভালো কোম্পনিগুলোর যারা আছে তারা আইপিও নিয়ে আসুক। লোকজনের কিন্তু বিনিয়োগ করার জন্য অর্থ আছে। ব্যাংকের উপর অনেকের আস্থা কমে গেছে রেট অব ইন্টারেস্ট কম। সঞ্চয়পত্রের সুদ কমে গেছে। অতএব ভালো ভালো কোম্পানিগুলো পুঁজিবাজারে আসতে হবে। আমি মনে করি পুঁজি বাজার কে চাঙ্গা করতে শুধু ব্যাংকের উপর নির্ভর করলে হবে না। কারণ ব্যাংকগুলো এখন লোন দিতে ভয় পায়। কারণ অলরেডি তারা খারাপ লোন দিয়েছে। এখন আমাদের যেটা করতে হবে তা হলো আর্থিক প্যাকেজটা বাস্তবায়ন। রপ্তানিটা আরেকটু বাড়ানো। শুধু পোশাক শিল্পের উপড় নির্ভর করলে হবে না। দেশীয় মাঝারি-ক্ষুদ্র শিল্পকে উৎসাহিত করলে কর্মসংস্থান হবে। আমাদের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হবে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Share via
Copy link
Powered by Social Snap