বিদেশ থেকে দেশে ফেরার আগে জানতে হবে এয়ারপোর্ট কাস্টমস ব্যাগেজ রুলস 

Share This:

অনলাইন ডেস্ক:

বিমান বন্দরে এক মহিলা যাত্রীর মর্মান্তিক ঘটনা। প্রায় দুবছর আগে ঘটে। বিরহী মা দীর্ঘ চেষ্টায় প্রবাসী পুত্রকে দেখতে যান মালয়েশিয়া। ফেরার দিন ছেলে মা’কে কুয়ালালাম পুর এয়ারপোর্টে চেক ইন করে কাজে ফিরে যায়। ফ্লাইট ঠিক মতোই ছেড়েছে ও ঢাকায় নেমেছে। কিন্তু মায়ের খোঁজ নেই। বাসায়ও ফেরেনি। বহু কসরতে জানতে পারল, অবৈধ স্বর্ণ বহনের জন্য মা কাস্টমসে ধরা পড়েছে। মামলায় দ্রুত বিচারে ছয় মাসের জেল হয়েছে।

ইমিগ্রেশন শেষ করে সেদিন ভেতরে যেতেই একজন বাঙ্গালীর সাথে তাঁর দেখা। কালো একটা ব্যাগ দিয়ে খুব মিনতি করে বলেছে ‘আন্টি, আপনার লাগেজ কম। এখানে আমার মেয়ের জন্য চকলেট, ঢাকায় কষ্ট করে পৌঁছে দেবেন।’ বললো, এয়ারপোর্টে তাঁর লোক থাকবে। সরল বিশ্বাসে অন্যের উপকার করতে গিয়ে ভদ্র মহিলার এমন বেহাল অবস্থা! এমন বহু ঘটনা বিমানবন্দরে চাকরি করতে গিয়ে নিজেও দেখেছি।

আমাদের দেশে স্বর্ণের মূল মালিক ধরা পড়ে না। এমন বাহকরা মামলা খায়। তবে, ব্যাগেজ রুলস জানলে তাঁর এ অবস্থা হতো না। তিনি অপরিচিত বা অল্প পরিচিতের কথায় ঝুঁকি নিতে না। স্বর্ণগুলো ঘোষণা দিয়ে শুল্ককর পরিশোধ করেও পরে নিতে পারতেন। অন্তত, ছয় মাস জেল খাটতে হতো না।

এ ধরণের ঘটনা যাতে আর কারো জীবনে না ঘটে। বিমানবন্দর ও বর্ডারের যাত্রীগণ ব্যাগেজ রুলস ও প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলো জেনে নিন…. ( বিদ্যমান যাত্রী ব্যাগেজ রুলস-২০১৬ এর আলোকে।)

✅গ্রীন চ্যানেল:
আপনার ব্যাগেজ শুল্কমুক্ত হলে গ্রীন চ্যানেল দিয়ে বের হয়ে যাবেন। এ ক্ষেত্র তফশীল-১ এর ফরমে (ফ্লাইট নামার আগে বিমানে দেয়া হয়) ঘোষণা দিতে হবে। ৫% ব্যাগ গ্রীন চ্যানেলে স্ক্যান ও পরীক্ষা হবে। কাস্টমস অফিসার চাইলে যে কারো ব্যাগ স্ক্যান বা খুলে পরীক্ষা করতে পারে। সাবধান!

🚫 রেড চ্যানেল: আপনার শুল্ককরযুক্ত পণ্য থাকলে রেড চ্যানেলে শুল্ককর পরিশোধ কররেন।

▪️বিদেশ থেকে শুল্কমুক্তভাবে—
👉 কি আনা যাবে? ✅
👉🏿 আর কি কি আনা যাবে না।🚫

📖 এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যাত্রী (অপর্যটক) ব্যাগেজ (আমদানি) বিধিমালা, ২০১৬ প্রণয়ন করেছে। নতুন বিধিমালা প্রণীত না হওয়ায় এ বিধিমালাটি এখনো কর্যকর রয়েছে।

নিচে এ বিধিমালা অনুয়ায়ী বিদেশ হতে আগত ও বিদেশগামী যাত্রীর সচরাচর জিজ্ঞাসিত (শুল্কযুক্ত ও শুল্কমুক্ত) গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দেয়া হলো:

▪️১. টেলিভিশন :
২৯” পর্যন্ত শুল্কমুক্ত হিসেবে আনা যাবে।
৩০”-৩৬” হলে ১০,০০০ টাকা,
৩৭”-৪২” হলে ২০,০০০ টাকা,
৪৩”-৪৬” হলে ৩০,০০০ টাকা,
৪৭”-৫২” হলে ৫০,০০০ টাকা,
৫৩” -৬৫” হলে ৭০,০০০ টাকা এবং
৬৬” এর বেশি হলে ৯০,০০০ টাকা
শুল্ক পরিশোধ করতে হবে।

▪️২. সিগারেট :
১ কার্টন (২০০ শলাকা) পর্যন্ত সিগারেট শুল্কমুক্ত হিসেবে আনতে পারবেন। এর বেশি আনলে কাস্টমস তা আটক করবে। সফটওয়্যার প্রিন্টেট আটক রশিদ (Detention Memo) বুঝে নিবেন। আটককৃত সিগারেট বিধি মোতাবেক বিক্রয়/ধ্বংসযোগ্য, তাই ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

▪️৩. মদ ও মদ জাতীয় পানীয় :
বাংলাদেশী পাসপোর্টধারী নাগরিকদের জন্য মদ আনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আনলে কাস্টমস তা আটক করবে। বিদেশী পাসপোর্টধারী নাগরিক হলে ২ বোতল বা সর্বোচ্চ ১ লিটার পর্যন্ত আনতে পারবেন। এর বেশি আনলে কাস্টমস তা আটক করবে। সফটওয়্যার প্রিন্টেট আটক রশিদ (Detention memo) বুঝে নিবেন। আটককৃত মদ বিধি মোতাবেক বিক্রয়/ধ্বংসযোগ্য, তাই ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

▪️৪. ল্যাপটপ :
১ টি শুল্কমুক্ত হিসেবে আনতে পারবেন। ২ টি পর্যন্ত শুল্ক-করাদি (প্রায় ১৬%) পরিশোধ সাপেক্ষে আনতে পারবেন। এর বেশি আনলে কাস্টমস তা আটক করবে। সফটওয়্যার প্রিন্টেট আটক রশিদ (Detention Memo) বুঝে নিবেন। আটককৃত ল্যাপটপ পরবর্তীতে Adjudication প্রক্রিয়ায় আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রক দপ্তরের ছাড়পত্র উপস্থাপন, শুল্ক-করাদি এবং অর্থদন্ড পরিশোধ সাপেক্ষে ফেরত পেতে পারেন।

▪️৫. স্বর্ণবার :
১ গ্রাম আনলেও শুল্ক-করাদি (প্রতি ১১.৬৭ গ্রাম এর জন্য ২০০০ টাকা) পরিশোধ করতে হবে। এভাবে ঘোষণা প্রদানপূর্বক ২৩৪ গ্রাম পর্যন্ত আনতে পারবেন। এর বেশি আনলে কাস্টমস তা আটক করবে। ঘোষণা না দিয়ে গ্রীন চ্যানেল অতিক্রমকালে স্বর্ণবার বহনকারী ধরা পরলে তা চোরাচালান হিসেবে গণ্য হবে। বর্ণিত অপরাধের দায়ে শুল্ক করাদি আরোপসহ অতিরিক্ত হিসেবে পন্যমূলের দ্বিগুন জরিমানা আরোপ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মামলার দীর্ঘসূত্রীতায় পণ্যটি পেতে অনেক সময় লাগতে পারে। অথচ ঘোষণা প্রদানপূর্বক নির্ধারিত শুল্ককরাদি পরিশোধ করে খুব সহজেই আপনার বহনকৃত স্বর্ণবারটি নিয়ে যেতে পারেন।
স্বর্ণবার আটক হলে সফটওয়্যার প্রিন্টেট আটক রশিদ (Detention Memo) বুঝে নিবেন।

▪️৬. স্বর্ণালংকার :
শুল্ক কর পরিশোধ ব্যতিরেকে একজন যাত্রী ১০০ গ্রাম পর্যন্ত (এক প্রকারের অলংকার ১২ টির অধিক হবে না) শুল্কমুক্ত স্বর্ণালংকার আনতে পারবেন। এর বেশি আনলে অতিরিক্ত প্রতি গ্রাম এর জন্য প্রায় ২০০০ টাকা শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। বাণিজ্যিক পরিমান বলে মনে হলে কাস্টমস তা আটক করবে। সফটওয়্যার প্রিন্টেট আটক রশিদ(detention memo) বুঝে নিবেন। আটককৃত স্বর্ণালংকার পরবর্তীতে Adjudication প্রক্রিয়ায় শুল্ক-করাদি এবং অর্থদন্ড পরিশোধ সাপেক্ষে ফেরত পেতে পারেন। আর চোরাচালান বলে মনে হলে কাস্টমস সরাসরি ফৌজদারি মামলা করবে।

▪️৭. মোবাইল ফোন :
একজন যাত্রী নিজের ব্যবহৃতসহ সর্বমোট ২ টি মোবাইল ফোন শুল্কমুক্ত হিসেবে আনতে পারবেন। শুল্ক-করাদি পরিশোধ সাপেক্ষে (প্রায় ৫৫.৬০%) ৩-৮টি পর্যন্ত মোবাইল আনতে পারবেন এর বেশি আনলে কাস্টমস তা আটক করবে। আটক হলে সফটওয়্যার প্রিন্টেট আটক রশিদ (Detention Memo) বুঝে নিবেন। আটককৃত মোবাইল ফোন Adjudication প্রক্রিয়ায় BTRC দপ্তরের ছাড়পত্র উপস্থাপন, শুল্ক-করাদি এবং অর্থদন্ড পরিশোধ সাপেক্ষে ফেরত পেতে পারেন।

▪️৮. নতুন শাড়ী_অন্যান্য কাপড়_কসমেটিক্স : ব্যাক্তিগত বিবেচনায় যুক্তিসংগত পরিমাণ শুল্কমুক্ত হিসেবে আনতে পারবেন। আরও কয়েকটি শুল্ক-করাদি (প্রায় ১২৮/১৫০%) পরিশোধ সাপেক্ষে আনতে পারবেন। এর বেশি আনলে বাণিজ্যিক বিবেচনায় কাস্টমস তা আটক করবে। আটক হলে সফটওয়্যার প্রিন্টেট আটক রশিদ (Detention memo) বুঝে নিবেন। আটককৃত পণ্য পরবর্তীতে Adjudication প্রক্রিয়ায় শুল্ক-করাদি এবং অর্থদন্ড পরিশোধ সাপেক্ষে ফেরত পেতে পারেন।

▪️৯. ঔষধ :
জরুরী বিবেচনায় প্রেসক্রিপশন দেখিয়ে যুক্তিসংগত পরিমাণ আনতে পারবেন। বাণিজ্যিক পরিমান বলে মনে হলে কাস্টমস তা আটক করবে। সফটওয়্যার প্রিন্টেট আটক রশিদ (Detention Memo) বুঝে নিবেন। আটককৃত ঔষধ পরবর্তীতে Adjudication প্রক্রিয়ায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ছাড়পত্র উপস্থাপন, শুল্ক-করাদি এবং অর্থদন্ড পরিশোধ সাপেক্ষে ফেরত পেতে পারেন।

▪️১০. বৈদেশিক মুদ্রা :
বিদেশে যাওয়ার সময় পাসপোর্টে এনডোরস [বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত ক্ষেত্র ব্যাতিত] ব্যাতিত কোন বৈদেশিক মুদ্রা সাথে নিতে পারবেন না। তবে বাংলাদেশী মুদ্রায় ১০,০০০ টাকা পাসপোর্টে এনডোরস ছাড়াই সাথে নিতে পারবেন। এনডোরস ব্যাতিত এর বেশী বৈদেশিক মুদ্রা সাথে নিলে কাস্টমস আটক করবে। আটক হলে সফটওয়্যার প্রিন্টেট আটক রশিদ (Detention Memo) বুঝে নিবেন। আর মুদ্রা পাচার/মানি লন্ডারিং বলে মনে হলে কাস্টমস সরাসরি ফৌজদারি মামলা করবে। বিদেশ থেকে ফেরার সময় ইচ্ছেমত বৈদেশিক মুদ্রা আনতে পারবেন। তবে ১০,০০০ ডলার/সমমান এর বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আনলে অবশ্যই কাস্টমস এর নিকট FMJ ফরম-এ ঘোষণা প্রদান করতে হবে।

▪️১১. সাময়িক আটক :
শুল্ক-করাদি পরিশোধ সাপেক্ষে খালাসযোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে তাৎক্ষনিক শুল্ক-করাদি পরিশোধ করার মত টাকা সাথে না থাকলেও ভয়ের কিছু নেই। সেক্ষেত্রে কাস্টমস তা সাময়িকভাবে আটক করবে। আটক রশিদ (Detention Memo) বুঝে নিবেন। সাময়িকভাবে আটককৃত পণ্য ২১ দিনের মধ্যে যথাযথ শুল্ক-করাদি পরিশোধ সাপেক্ষে ফেরত পেতে পারেন।

▪️১২. কার্গো বুকিং পণ্য ঘোষণা :
বিদেশ থেকে আসার আগে কার্গোতে ব্যাক্তিগত মালামাল বুকিং দিয়ে আসলে বাংলাদেশে নেমেই/৭ দিনের মধ্যে এয়ারপোর্ট কাস্টমস এর নিকট এয়ারওয়ে বিল এবং পাসপোর্টসহ উপস্থিত হয়ে নির্ধারিত “এ-ফরম” পূরণ করে মালামাল এর ঘোষণা প্রদান করবেন। অনুমোদিত “এ-ফরম” এর কপি নিয়ে মালামাল আসার পর শুল্ক-করাদি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) পরিশোধ সাপেক্ষে এয়ারফ্রেইট ইউনিট থেকে মালামাল নিতে পারেন।

▪️১৩. নির্দিষ্ট শুল্কের পণ্য:
যাত্রীর সাথে বহনকৃত কিছু পণ্যের শুল্কের পরিমানঃ
1. হোম থিয়েটার/মিউসিক সেন্টার ৪ এর অধিক সর্বোচ্চ ৮ টি -৮০০০/- টাকা
2. রেফ্রিজারেটর -৫০০০/- টাকা
3. এয়ার কন্ডিশন- ৭০০০-২০০০০/- টাকা
4. ডিশ এন্টিনা -৭০০০/- টাকা
5. Professional কাজে ব্যবহত HD, DV, BETA Cam- -১৫০০০/- টাকা
6. ঝাড়বাতি -৩০০/- টাকা (প্রতি পয়েন্ট)
7. ওয়াশিং মেশিন-৩০০০/- টাকা

▪️১৪. একটি করে ফ্রি পণ্য:
শুল্ককরাদি পরিশোধ ব্যতিরেকে সম্পূর্ণ ফ্রিতে ১ টি করে যে সকল পণ্য আনা যাবে-
1. ক্যাসেট প্লেয়ার/টুইন ওয়ান
2. ডিস্কম্যান/ওয়াকম্যান (অডিও)
3. বহনযোগ্য অডিও সিডি প্লেয়ার
4. ডেস্কটপ/ল্যাপটপ
5. কম্পিউটার প্রিন্টার
6. কম্পিউটার স্ক্যানার
7. ফ্যাক্স মেশিন
8. ভিডিও ক্যামেরা (Professional কাজে ব্যবহৃত)
9. স্টীল/ডিজিটাল ক্যামেরা
10. টেলিফোন সেট
11. মাইক্রোওয়েভ ওভেন
12. রাইস/প্রেসার কুকার
13. টোস্টার/জুসার/কফি মেকার ও অনুরূপ
14. টাইপরাইটার
15. গৃহস্থলি সেলাই মেশিন
16. ফ্যান
17. খেলাধুলা সামগ্রী (ব্যক্তিগত)
18. ১০০ গ্রাম স্বর্ণালংকার ২০০ গ্রাম রৌপ্য অলংকার
19. ২০০ শলাকা সিগারেট
20. ২৯” পর্যন্ত টেলিভিশন
21. ভিসিআর/ভিসিপি
22. হোম থিয়েটার/মিউসিক সেন্টার ৪ এর অধিক পর্যন্ত
23. এলসিডি কম্পিউটার মনিটর ১৯” পর্যন্ত
24. ২ টি মোবাইল (ব্যবহৃতসহ)
25. কার্পেট ১৫ বর্গমিটার পর্যন্ত

▪️১৫. মৃত ব্যক্তির ব্যাগেজ:
বাংলাদেশী কোন নাগরিক বিদেশে মৃত্যুবরণ করলে মৃত ব্যক্তির ব্যাগেজ সকল শুল্ক কর পরিশোধ ব্যতিরেকে খালাস করা যাবে।

▪️ ১৬. হুইলচেয়ার:
অসুস্থ পঙ্গু বৃদ্ধ যাত্রীর হুইল চেয়ার ও ব্যবহার্য্য চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সকল শুল্ক কর পরিশোধ ব্যতিরেকে খালাস করা যাবে।

🚫 সাবধানঃ
সুতরাং অপরিচিত ব্যাক্তি এবং ব্যাগেজ-কে বিশ্বাস করা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই না জেনে অন্য কারো দেওয়া মালামাল বহন করবেন না!

👉 জীবন ও সম্মান আগে:
এ ভদ্রমহিলার মতো এভাবে বিদেশে অপরিচিত বা হাল্কা পরিচিত কারো জিনিস বহন করবেন না। ছয় মাস জেল স্বর্ণের মূল মালিক খাটেনি। তাঁর সন্তানও মায়ের অভাবে দিশেহারা হয়নি।

*ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

Loading...
error: Content is protected !!