জীবন গড়েছি বার্সায়, তাই লড়াইয়ে যেতে চাইনি’- মেসি

স্পোর্টস ডেস্ক:

কেন ছাড়তে চেয়েছেন আর কেনইবা শেষ পর্যন্ত থেকে যাচ্ছেন- মোটা দাগে প্রশ্ন এ দুটো। প্রসঙ্গান্তরে আছে ক্লাব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক, পরিবারের প্রতিক্রিয়া, অসন্তুষ্টির নেপথ্যে নানা অভিযোগ আর ক্ষোভ ও কৃতজ্ঞতার নির্মোহ বয়ান। লিওনেল মেসি দুই দশকের বার্সেলোনা ক্যারিয়ারে সবচেয়ে আলোচিত সাক্ষাৎকারটি দিলেন গোল ডটকমের সঙ্গে। ২৫ আগস্ট ক্লাব ছাড়তে চেয়ে বার্সেলোনাকে ব্যুরোফ্যাক্স পাঠানো থেকে শুরু করে ৪ সেপ্টেম্বর ‘আমি থাকছি’ বার্তা দেওয়া পর্যন্ত ১০ দিন রীতিমতো ‘টক অব দ্য স্পোর্টস ওয়ার্ল্ড’ হয়ে ছিলেন আর্জেন্টাইন সুপারস্টার।

এই সময়ে চলে যেতে চাওয়ার কারণ

মেসি: ক্লাব প্রেসিডেন্টকে আমি অনেকবার বলেছি যে, আমি চলে যেতে চাই। মনে হয়েছে আমার সরে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। ক্লাবের মধ্যে তরুণ খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ বাড়ানো দরকার, নতুন ধ্যান-ধারণা আনা দরকার। আমারও দিন ফুরিয়ে এসেছে। চলে যাওয়ার কথা বলতে আমার খারাপও লেগেছে। কারণ, সবসময়ই বলে এসেছি এখানে ক্যারিয়ার শেষ করতে চাই। কিন্তু সত্যি হচ্ছে, শেষ বছরে খুব কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। ট্রেনিংয়ে, খেলায়, ড্রেসিংরুমে আমি প্রচুর ভুগেছি। সবকিছু যখন জটিল হয়ে উঠছিল, তখনই নতুন উচ্চাশা নিয়ে এগোনোর কথা ভাবা শুরু করি। এই ভাবনাটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বায়ার্নের কাছে হারের কারণে হয়নি। আমি অনেক দিন ধরেই চলে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম। প্রেসিডেন্টকে বলেছি। তিনিও বলেছেন, মৌসুম শেষে আমি থাকা না থাকার সিদ্ধান্ত নিতে পারব। কিন্তু তিনি তার কথা রাখেননি।

একা মনে হয়েছে ওই সময়?

মেসি: আমার একা লাগেনি। যারা সবসময় আমার পাশে থাকেন তারা সবাই আমাকে শক্তি জুগিয়েছেন। তবে কিছু মানুষ, কিছু সাংবাদিকের কথা শুনে কষ্টও পেয়েছি। তারা বার্সেলোনার প্রতি আমার দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এমন কিছু বলেছেন, যা আমার প্রাপ্য ছিল না। এতে অবশ্য আমি মানুষ চিনেছি। ফুটবলের জগতটা খুব কঠিন, এখানে অনেক ভুয়া লোক আছে। তাদের আমি চিনতে পেরেছি। আমার খারাপ লেগেছে, যখন ক্লাবের প্রতি আমার ভালোবাসাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। আমি বার্সেলোনায় যতদিনই থাকি বা না থাকি, এই ক্লাবের প্রতি ভালোবাসা কখনও বদলাবে না।

টাকার জন্য যাচ্ছেন বলে অভিযোগ…

মেসি: আমি সবসময় ক্লাবকে সবার ওপরে রেখেছি। অনেকবার বার্সা ছাড়ার সুযোগ ছিল আমার। প্রতিবছরই আমি যেতে পারতাম, বার্সেলোনার চেয়ে বেশি কামাইও করতে পারতাম। কিন্তু যাইনি। বলেছি, এটা আমার বাড়ি। সুতরাং এর চেয়ে ভালো জায়গা আছে- এমন সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন ছিল। তবু মনে হয়েছে আমার পরিবর্তন দরকার, নতুন লক্ষ্য দরকার, নতুন কিছু দরকার।

সিদ্ধান্ত নেওয়া কতটা কঠিন ছিল?

মেসি: অবশ্যই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কঠিন ছিল। এটা কিন্তু বায়ার্ন ম্যাচের ফল থেকে আসেনি। অনেক কিছু এখানে জড়িত। এখানে ক্যারিয়ার শেষ করার কথা আমি সবসময় বলে এসেছি। কারণ, নতুন কর্মসূচি থাকবে, সেগুলো জয় করব, শিরোপা জিতব, বার্সেলোনার কীর্তিগাথাকে আরও বড় করে তুলব- এসব ছিল ভাবনা। কিন্তু সত্যিটা হচ্ছে দীর্ঘসময় ধরে এই ক্লাবের কোনো সুদূরপ্রসারী কর্মসূচি বা পরিকল্পনা নেই। ভেলকিবাজি আর জোড়াতালি দিয়েই ক্লাব চলছে। যেটা আমি আগেই বললাম, আমি পরিবার এবং ক্লাবের কল্যাণের কথাই ভেবেছি।

যখন আমি আমার স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে বার্সেলোনা থেকে বিদায়ের বিষয়ে আলাপ তুললাম, তখন নিষ্ঠুর এক নাটকীয়তা তৈরি হলো। ঘরের সবাই কান্নাকাটি শুরু করল। আমার ছেলে বার্সেলোনা শহর ছাড়তে রাজি নয়, স্কুল ছাড়তে রাজি নয়। আমি চেয়েছি সামনের দিকে তাকাতে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে আরও প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলতে, শিরোপা জিততে, চ্যাম্পিয়ন্স লিগে লড়াই করতে। খেলতে নামলে আপনি জিততে পারেন, হারতেও পারেন। তবে লড়াইয়ে আপনাকে থাকতে হবে। অন্তত এমন লড়াই, যেটা আমাদের রোম, লিভারপুল বা লিসবনের মতো ভেঙেচুরে দেবে না। মূলত এসব ভাবনাই আমাকে চলে যেতে উদ্বুদ্ধ করেছে।

আমি ভেবেছি এবং নিশ্চিতও ছিলাম যে, আমি ফ্রিতে চলে যেতে পারব। প্রেসিডেন্ট সবসময়ই বলে এসেছেন মৌসুমের শেষদিকে আমি থাকা না থাকার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারব। এখন তারা একটা কথাতেই জোর দিচ্ছেন যে, আমি কেন ১০ জুনের আগে বললাম না। অথচ ওই সময় আমরা করোনাভাইরাস ভয়াবহতার মাঝে লা লিগা খেলছি। পুরো মৌসুমও ওলটপালট হয়ে গেছে। আমি তাই ক্লাবের সঙ্গে কথা না বলে তখন খেলা চালিয়ে গেছি। এখন প্রেসিডেন্ট বলছেন, যেতে হলে ৭০০ মিলিয়ন ইউরো দিয়ে যেতে হবে। এটা অসম্ভব। এখানে আরেকটা পথ ছিল আদালতে যাওয়া। আমি কখনোই বার্সেলোনার বিপক্ষে আদালতে যাওয়ার কথা ভাবিনি। কারণ, এখানে আসার পর এই ক্লাব আমাকে সব দিয়েছে, আমি এখানে জীবন গড়েছি। বার্সা আমাকে সব দিয়েছে, আমিও নিজের সবটুকু দিয়েছি। আমার জীবনের ক্লাবকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার কথা আমার মনে কখনোই আসেনি।

গত ক’দিন বেশি কষ্টদায়ক লেগেছে?

মেসি: বেশি কষ্ট লেগেছে আমার বিরুদ্ধে অনেক কথা ছড়ানো হয়েছে বলে। কিছু মিথ্যা কথাও প্রচার হয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, নিজের স্বার্থে আমি বার্সেলোনাকে আদালতে নিয়ে যাব। এটা আমি কখনোই করব না। আবারও বলছি, আমি যেতে চেয়েছি, এটা আমার অধিকার। চুক্তিতেও ওরকমই লেখা আছে। এখন তো আর যাচ্ছি না। যেতে চেয়েছি বলতেই অনেক ভোগান্তি পোহাতে হলো আমাকে। শেষ বছরটা ভালো ছিলাম- এমন অনুভূতি নিয়ে যেতে চেয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্লাবের মধ্যে আমি সুখ খুঁজে পাইনি।

বার্সার প্রতি দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন

মেসি: আমি বার্সেলোনাকে ভালোবাসি এবং এর চেয়ে ভালো জায়গা আমি অন্য কোথাও পাব না। তারপরও আমার নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে, যদি চুক্তি এবং প্রেসিডেন্ট আমাকে সেটার সুযোগ দেন। আমি নতুন লক্ষ্য এবং নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে চেয়েছি।

আমার সন্তান, আমার সংসার বড় হয়েছে এখানে। তারা এটাকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করে। তারপরও আমার চলে যেতে চাওয়ায় কোনো ভুল ছিল না। চলে যাওয়াটা আমার নিজের জন্য দরকার ছিল, ক্লাবের দরকার ছিল, সবার জন্যই এটা ভালো হতো।

পরিবারের সদস্যদের প্রতিক্রিয়া…

মেসি: আমার স্ত্রী এ সিদ্ধান্তে প্রচণ্ড কষ্ট পেলেও আমাকে সমর্থন করেছে, আমার পাশে থেকেছে। আমার ছেলে মাতেও এখনও ছোট, অন্য কোথাও যাওয়ার মানে যে জীবনের কয়েক বছর সেখানে কাটিয়ে দেওয়া, এটা বোঝার মতো বয়স ওর হয়নি। থিয়াগো ওর বড়। আমাদের চলে যেতে হবে, ওকে নতুন স্কুলে নতুন বন্ধুদের সঙ্গে পড়তে হবে- এ ধরনের কোনো কিছুই তাকে বলিনি। তবে টিভি দেখে কিছু একটা জেনেছে। এরপর আমার কাছে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলল- ‘আমরা না যাই।’ খুবই কষ্টের মুহূর্ত ছিল ওটা।

চলে যাওয়ার বার্তা দিতে ব্যুরোফ্যাক্স কেন?

মেসি: ব্যুরোফ্যাক্স পাঠিয়েছি আমার ইচ্ছের বিষয়টিকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে। আমি কিন্তু নোংরামি করতে চাইনি, ক্লাবের বিপক্ষেও যেতে চাইনি। বছরজুড়ে প্রেসিডেন্টকে আমি চলে যেতে চাওয়ার কথা বলেছি। বলেছি, আমার ক্যারিয়ারে নতুন লক্ষ্য নতুন পথ খোঁজার সময় এসে গেছে। তিনি আমাকে বলেছেন, এ নিয়ে কথা বলব। তবে এখন নয়। এটা সেটা। কিন্তু আসলে কিছুই নয়। তিনি সত্যিকারভাবে কী বলতে চেয়েছেন, সেই ইঙ্গিত আমাকে কখনও দেননি। আমি যদি ব্যুরোফ্যাক্স না পাঠাতাম তবে ব্যাপারটা দাঁড়াত যে, কই কিছুই তো হয়নি। চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে জানাতেই ওই বার্তা পাঠিয়েছিলাম।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

Share via
Copy link
Powered by Social Snap