উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে মাথাপিছু আয়ের সীমাবদ্ধতা

হারুন আল নাসিফ

উন্নয়নের সূচক হিসাবে জাতীয় আয়ের সীমাবদ্ধতার কারণে রোস্টো, বারান ও লাইবস্টেইন প্রমুখ অর্থনীতিবিদ উন্নয়নের সূচক হিসাবে মাথাপিছু আয়ের ব্যবহারের পক্ষে ছিলেন। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা তাদের, ‘অনুন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিমাপ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই মানদণ্ডকে মেনে নিয়েছেন।

মাথাপিছু আয় বলতে মোটা দাগে একটি দেশের প্রকৃত জাতীয় আয়কে মোট জনসংখ্যার দ্বারা ভাগ করে প্রাপ্ত ফলকে বোঝায়। জনসংখ্যার হার যদি জাতীয় আয়ের বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে যায়, তবে মাথাপিছু জাতীয় আয় হ্রাস পাবে।

 

একইভাবে যদি জাতীয় উৎপাদন এবং জনসংখ্যা উভয়ই একই হারে বৃদ্ধি পায় তবে মাথাপিছু জাতীয় আয় স্থির থাকবে। এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়।
তাই প্রকৃত জাতীয় আয়ের বৃদ্ধি নয়, বরং প্রকৃত মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধিকেই উন্নয়নের সূচক হিসাবে গ্রহণ করা যেতে পারে। সুতরাং বিশেষত অনুন্নত দেশগুলোতে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণ করা, বিবেচনায় রাখা এবং সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার পাশাপাশি জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার ত্বরান্বিত করা জরুরি, যাতে মাথাপিছু প্রকৃত আয় বাড়ে।

 

উন্নয়নের সূচক বা মাপকাঠি হিসাবে মাথাপিছু আয়ের নিম্নলিখিত সীমাবদ্ধতা রয়েছে:
১. মাথাপিছু আয় মানুষের জীবনযাত্রার মান প্রতিফলিত করে না। মাথাপিছু আয় একটি গড় এবং যদি বর্ধিত জাতীয় আয় অনেক দরিদ্রকে দেওয়ার পরিবর্তে স্বল্প সংখ্যক ধনীর হাতে চলে যায়, তাহলে এই গড় মানুষের জীবনযাত্রার মানের প্রতিফলন ঘটাতে পারে না। সুতরাং জাতীয় আয় ন্যায্য, সুষম বা সমানভাবে বণ্টন না করা হলে মাথাপিছু আয় উন্নয়নের যথার্থ বা সন্তোষজনক সূচক হিসাবে কাজ করে না।

২. মাথাপিছু আয় যদি মাপকাঠি হয়. তাহলে জনসংখ্যার সমস্যাটি তখন আড়ালে চলে যায়। কেননা জনসংখ্যা ততক্ষণে ভাজক হিসেবে নিচে চলে গেছে। ফলে যাচা্ই করে বা তলিয়ে দেখার ক্ষেত্রটি সংকীর্ণ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে কুজনেটস সতর্ক করে দেন যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার নির্ধারণের জন্য মাথাপিছু বা একক প্রতি আয় বা অনুরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে অনুপাতের ডিনোমিনেটর (জনগণ)কে অবহেলা বা উপেক্ষা করার ঝুঁকি থাকে।

৩. মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধি মানুষের জীবন-যাপনের মান বাড়িয়ে তুলতে নাও পারে। এটা হওয়া সম্ভব যে মাথাপিছু প্রকৃত আয় বাড়লেও মাথাপিছু পণ্য ও পরিষেবা ভোগ কমেছে। এটি হতে পারে যখন সরকার সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ উৎপাদনের মতো প্রয়োজনে অথবা অন্য কোনো কারণে বর্ধিত আয় নিজেই ব্যবহার করে ফেলে।

৪. যদিও মাথাপিছু আউটপুট বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন, তবু আমরা এটিকে অর্থনৈতিক কল্যাণ বৃদ্ধির সমার্থক হিসেবে ধরে নিতে পারি না। অন্যান্য বিবেচ্য বিষয় ছাড়াও সামাজিক কল্যাণের কথা দূরে থাক। উন্নয়ন যেহেতু বহুমাত্রিক সেহেতু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্ম-অবসর অনুপাত ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়গুলো মাথাপিছু আয়ে প্রতিফলিত হয় না।

লেখক : হারুন আল নাসিফ : কবি, ছড়াকার, সাংবাদিক।

(ফেসবুক থেকে নেয়া)

Share This:
Loading...
Share via
Copy link
Powered by Social Snap